Sunday, August 30, 2009

বাঙালীর পণ বাঙালীর আশা, বাঙালীর কাজ বাঙালীর ভাষা, সত্য হোক। সত্য হোক। সত্য হোক।

শনি, ২১/০২/০৯ – ১২:৫৪ পুর্বাহ্ন

উনবিংশ শতকের শেষপাদে বাঙালী জাতির যে জাগরণ ঘটছিল তা দ্রুতই রূপ পেল বাঙালী রেনেসাঁয়। অথচ বিংশ শতকের চল্লিশের দশক এসে তা উবে গেল দ্বি-জাতি তত্তের ইসলামী ঝংকারে। এই সময়টুকু বাঙালীর কেটেছে অদ্ভূত এক অস্থিরতায়। তারপরও ইতিহাস বলে স্বাধীকার আন্দোলনকে বাস্তব রূপদানের এটিই ছিল স্বর্ণযুগ।

জাতি আর রাষ্ট্র যে ভিন্ন সত্তা সেটা বুঝতে বাঙালীরও সময় লেগে গেল বেশ কয়েকটি বছর। এক অর্থে বলা যায় সে শিক্ষাটি তরান্বিত করেছিল পাকিস্তানের বাপ জিন্নাহ। বাঙালী এই প্রথমবারের মত উপলব্ধি করল তার আসল পরিচয় সে বাঙালী। দ্বি-জাতির কথা বলে জিন্নাহ গড়ে তুলেছিল বাঙালী, পাঠান, পাঞ্জাবী, পশতু সব মিলিয়ে বহুজাতিক এক দেশ। উদ্দেশ্য ছিল একটাই – শোষণ। পাকিস্তান আক্ষরিক অর্থেই ছিল এক বৃহৎ শোষণের যন্ত্র। আখের রস বের করার মত মত করে নিঙড়ে ছোবড়া বানিয়ে দিচ্ছিল লঘিষ্ঠকে। বিদেশী ইংরেজ বেনিয়া যেমন করে ভারতবর্ষের সম্পদ লুঠ করে নিয়ে যেত সাগরের ঐ পাড়ে, বুর্জোয়া পাকিস্তানি প্রশসনই তাই করছিল, এপাড়ের সম্পদ দিয়ে ওপাড়ে গড়ে তুলছিল একের পর এক রাজধানী।

তাই বাঙালী যখন আত্মপরিচয় খুঁজে পেল, দিশেহারা হয়ে পড়েছিল পাকিস্তান নামক যন্ত্রটি। খুব একটা দেরীও তাই তারা করেনি, বুর্জোয়ার প্রিয় জলপাই উর্দি এসে তখন দায়িত্ব নিল নিরন্ন-বিবস্ত্র জনতাকে শোষনের চাকাটি চালু রাখতে। কিন্তু গণবিপ্লব এমনই এক বস্তু যাকে ঠেকানোর ক্ষমতা পৃথিবীর কোন শক্তিরই নেই। বায়ান্নতে যে পরিচয় বাঙালীকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল বস্তুত সেই বাঙালী পরিচয়ই বাঙালীর আসল পরিচয়। একবার স্বাধীন হওয়ার দুই যুগ পরে বাঙালী আবারও স্বাধীনতার লড়াই করল – সেও সেই পরিচয়ের ঐক্যের জোরেই। বরং সেবার প্রমাণ হয়ে গেল যে ধর্মের ভিত্তিতে যে জাতিতত্ত্ব জিন্নাহ মশায় বাঙালীকে গিলিয়েছিল তা বাঙালীর জন্য মোটেও উপাদেয় নয়, বরং বিষ। ঘৃনাভরে বাঙালী তা উগরে দিল নয় মাস ধরে। শুধু আত্মপরিচয়ই নয়, বাঙালী এই দু’যুগে প্রস্তুত করল তার সত্যিকারের মুক্তির চারটি ভিত্তি – জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষতা।

কিন্তু বড়ই আফসোসের বিষয়, বাঙালী স্বাধীন রাষ্ট্র পেল ঠিকই, মুক্তি পেল না। কেন পেল না! কারণ ঐ একই – নামেরই শুধু বদল হয়েছে, আসলে ‘বাংলাদেশ’ রয়ে গেছে সেই সাবেকী শোষনের যন্ত্রই। কারণ, চার মূলনীতির একটিও বাঙালী পায়নি। জাতীয়তাবাদ ঢেকে গেছে ভাষা না রাষ্ট্র এই পরিচয়ের খোলসে। সমাজতন্ত্রীদের হাজারে-বিজারে হত্য করা হয়েছে – বিচারে, বিনাবিচারে। গণতন্ত্রের কথা কি আর বলব, গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য যে উপাদান জনগণ, তাদেরকেই রাখা হয়েছে অন্ধকারে; ভয় একটাই, ওরা ক্ষেপে উঠলে আরেক ‘৬৯ আসবে কিংবা আসবে ‘৭১। এভাবে জনগণের অসহায়ত্বের সুযোগে বার বার হানা দিয়েছে ক্যান্টনমেন্টের সাধুরা! যাদের পেটের খাওয়া এই জনতার পয়সায়ই জোটে, যাদের কথা ছিল জনতার রক্ষক হবার। হয়নি। বরং এমন সাধুরা এসে মুছে দিয়ে গেছে বাঙালীর মুক্তির আরেক শর্ত – ধর্মনিরপেক্ষতা।

কিন্তু এত কিছুর পরেও আশা ছাড়তে পারি না। ভরসা রাখি ঐ নিরন্ন মানুষের উপরেই। কারণ ওদের জাগতে আর কিছুরই প্রয়োজন নেই, শুধু একটি জিনিস বাদে। সেটি হল একটি পরিচয়। যে পরিচয় সবাইকে একটি সমতার প্রাঙ্গণে এনে দাঁড় করিয়ে দেবে। সেই পরিচয়টি হল আমরা বাঙালী।

বাঙালীর পণ
বাঙালীর আশা,
বাঙালীর কাজ
বাঙালীর ভাষা,
সত্য হোক।
সত্য হোক।
সত্য হোক।

‘সন্ত্রাসী’ হওয়া ছাড়া তার আর কি গন্তব্য থাকতে পারে?

Gaza

“ত্বতীয় মিসাইলটিও এসে পরল। আগের দু’টির একটির আঘাতে আমার বড় ভাই মারা গেল। আর বাকীদের বেশীরভাগই আহত হয়েছিল – রক্তাক্ত হয়ে কাতরাচ্ছে এখানে ওখানে। মাত্র একদিন আগেই আমাদের ত্রিশজনকে এই বাড়িটিতে পাঠিয়েছিল ইসরায়েলিরা। আমার ভাইটি আমার চোখের সামনে রক্তক্ষরণে কাতরাতে কাতরাতে মারা গেল। আমি অযথাই ছুটাছুটি করে পানি খুঁজতে গেলাম।”

দমকে দমকে ওঠা কান্না সামলে ছেলেটি বলে চলল, “আমার আরেক ভাই, ইসমায়েলও মারা গেল রক্তক্ষরণে – আমারই চোখের সামনে। আমার মা ও ছোটভাই, তারাও মারা গেল একইভাবে – গোলার আগাতে আহত হয়ে রক্তক্ষরণে। চার ভাই আর মা এরাই ছিল প্বথিবীতে আমার আপনজন; তারা সবাই আজ মৃত। আল্লা তাঁদের আত্মার শান্তি দিন।”

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ১৬ বছরের ফিলিস্তিনী কিশোর আহমেদ সামুনী এভাবেই বর্ণনা করছিল ৫ই জানুয়ারীর ইসরায়েলি আক্রমণ। জাতিসংঘ বলছে, যায়তুন শহরের একটি বাড়ীতে জনা তিরিশেক ফিলিস্তিনিকে পাঠিয়ে দিয়েছিল ইসরায়েলী সৈন্যরা। তারপর দিনই তাদের হত্যা করতে বাড়িটিতে তিনটি মিসাইল ছোড়ে তারা।

পিত্ব-মাত্ব-ভ্রাতা-ভগ্নীহীন হতভাগ্য আহমেদ হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর কি করবে এই নির্মম দানব শহরে? ‘সন্ত্রাসী’ হওয়া ছাড়া তার আর কি গন্তব্য থাকতে পারে? পাঠকের কাছে প্রশ্ন রইল।

ঈশ্বরের বিরুদ্ধে প্রচারণা

প্রায় সকল মানব সমাজেই ঈশ্বর অতি আদরের উপকরণ। রাজ-দন্ডের মালিক চিরদিনই ঈশ্বরের একান্ত সেবক, রক্ষক প্রমোটার। তাই ঈশরের বিরুদ্ধে যাওয়া কখনই সহজে সম্ভব ছিল না। একটা সময় ছিল যখন ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাস করা ছিল রাজ-অপরাধ। ঈশ্বরের বা তার প্রেরিত দূতদের বাণীর বিরুদ্ধে একটি বাক্য উচ্চারণের দায়েও নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে এমনকি প্রাণও দিতে হয়েছে বহু ‘নাস্তিককে’। কোপার্নিকাস, ব্রুনো, গ্যালিলিও এরকম হাজার উদাহরণ আছে ইতিহাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। অথচ মজার ব্যাপার হচ্ছে সেসব বাক্য ইদানিং ঈশ্বরের সেবকরাও প্রচার করছে, ঈশ্বরের মহিমা হিসেবেই!

তারপরেরও ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে নাস্তিকরা টানাটানি করেছে – সে বহুদিনের ইতিহাস, নতুন নয়। নাস্তিকরা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে মশকরা এখনো করে যাচ্ছে। ইদানীং নাস্তিকরা জোরেসোরে এক নতুন ‘ভেক’ ধরেছে – ‘মিলিট্যান্ট এ্যাথেইজম’। নাস্তিকরা হঠাৎ করে যুদ্ধংদেহী হয়ে উঠছে প্বথিবীব্যাপী! ওয়াশিংটন ও লন্ডনে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে রীতিমত পয়সা খরচ করে বিজ্ঞাপণ প্রচার করছে নাস্তিকরা। ব্রিটেইনজুড়ে ৮০০ বাসের গায়ে বিজ্ঞাপণ সাঁটানো হয়েছে – “সম্ভবত কোন ঈশ্বর নেই, তাই এখন দুশ্চিন্তা বাদ দিয়ে জীবনটাকে উপভোগ কর।” এই বিজ্ঞাপণে অনুপ্রানিত হয়ে স্পেন ও ইতালির নাস্তিকরাও বিপুল প্রচারণায় নেমে পড়েছে।
Atheist Bus Campaign

প্রফেসর রিচার্ড ডকিন্স ‘সম্ভবত’ শব্দটির ব্যাপারে তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করেছেন যেটি কর্ত্বপক্ষ জোর করে ঢুকিয়ে দিয়েছে। তাদের বলছে এটি প্রমানসাপেক্ষ ব্যাপার, তাই সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে। হুমমম…ঈশ্বরের সেবকরাই এখনও তাহলে বেশি শক্তিশালী! চার্চের বা মসজিদের পান্ডারা যখন মহাসমারোহে প্রচার করতে থাকে ঈশ্বর হ্যান ঈশ্বর ত্যান তখন তো প্রমাণের প্রয়োজন পরে না। তখন লাগে না ‘সম্ভবত’ ধরনের কোন শব্দের সংযোজন।

নাহ্‌ ঈশ্বর তার বিশ্বাসীদেরকে এখনও ফেয়ার প্লে শেখাতে পারেননি।

ভোটের নাটক আর বাঙালীর মুক্তির দূরাশা

বাঙালীর পিঠ দেয়ালে না ঠেকলে সে কিছুই করে না, চুপাচাপ আলসেমি উপভোগ করে। যখন ঠিক পাছার গোড়ায় হাগু এসে পরে, তখন শয়তান-নমরুদ যাকে পায় তার ছায়ার তলে গিয়ে আশ্রয় নেয়। কিন্তু এভাবে শেষ রক্ষা হবে কী? এইবার নাহয় বেকুব বাঙালী আওয়ামি লীগকে ভোট দিয়ে ঝামাতের হাত থেকে দেশ ও জাতিকে বাঁচিয়ে মহাউল্লাসে ফেটে পরল, তারপর? বাঙালীরা ঝামাতকে ‘না’ বলতে পারলেও ভবিষ্যতের আওয়ামীলীগ কি তা পারবে? অতীতে কি তা পেরেছিল?

বাঙালী তার অতীত বেকুবির শাস্তি হিসেবে আজকের শ্বাসরোধী অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী ঠেকাতে বিএনপি আর বিএনপি ঠেকাতে আওয়ামী। এই করে আর কত? চামে চামে ঝামাতের শিকড় লকলক করে বাড়ছে, বাড়তে বাড়তে এখন ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরে পৌঁছে গেছে; পুরোটা শুষে নেবে বলে সরব-নীরব হুমকী দিচ্ছে। বাঙালী আবারও ভাবছে কি করা যায়! বিএনপি একদিন আওয়ামীলীগকে ঠেকাতে ঝামাতের সাথে বউচি খেলতে গিয়েছিল। এখন ঝামাত তাকে ঠিক করে দেয় কার পরে কে চি দেবে। তারপরেও বিএনপি’র শিক্ষা হয়নি। আহারে শিক্ষার কোন শেষ নেই!

হে নির্বোধ বাঙালী জাতি, এরা কেউই তোমার বন্ধু না। তোমার আচরণ পাল্টাও, চরিত্র পাল্টাও, আসল পরিচয় খুঁজে বের কর – অটোমেটিক তোমার নেতা আর নীতি পেয়ে যাবে। এই ধূর্ত আর খল রাজনীতির বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেতে আর কোন বিকল্প নেই।

পাবলিকের ক্ষমতার উৎস নাকি তার সংঘবদ্ধ হওনের ইছ্ছায়…হাসতে হাসতে শেষ

পাবলিকের ক্ষমতার উৎস নাকি তার সংঘবদ্ধ হওনের ইচ্ছায়। হাসতে হাসতে শেষ! এই পাবলিক যেই সেই পাবলিক না দাদারা – এরা স্বাধীন বাংলাদেশের পাবলিক। এগো ধারনা, খাইতে না পাই তো কি হইছে! দ্যাশ তো স্বাধীন :)! তারপরেও কইবেন পাবলিকের সংঘবদ্ধ হওনের ইচ্ছাই যথেষ্ঠ?

মাগার পাবলিকের যে ইচ্ছাই নাই, সেইটার কি হইব! বাপে খুন করে পোলারে, পোলায় বাপেরে, ভাইয়ে করে ভাইরে খুন। ঘরে ঘরে সারা দেশে ইলেক্শান আইলেই মানুষ পাগলা কুত্তা হয়া যায়। ইলেক্শান শেষ, পাবলিক আবার গত্তে ঢুকে। জিনিসপত্রে দাম বাইরা আসমানে, পেট ফুইলা মইরা গেলেও পাবলিক আওয়াজ করে না। বাচ্চাগো দুধে ম্যালামাইন, ঝণ-পেরতিনিদি পাবলিকেরে আবঝাব বুজাইতাছে, দ্যাশে-বিদ্যাশে-য়ুরপ-আম্রিকায় টেসটিং হইতাসে, পাবলিক চুপ। পাবলিকের ফান্ডে পেরতিনিদিগো বাল-বাচ্চা-শালা-দেওর মউজ-মাস্তি করতাছে, পাবলিক চুপ। উত্তরান্চল খা খা করতাসে, বছরের ৬ মাস কাম-খাওন নাই, পাবলিক চুপ। দক্ষিনান্চলে ঝড়বন্যা লাইগাই রইছে – ঝড়-বইন্যা হইলেই পেরতিনিদিরা খুশি, বিদেশীরা কানতে কানতে আইসা কড়ি ঢাইলা দিব, পাবলিক চুপ। ঢাকা শহরে ৩০ পার্সেন্ট আদম সন্তান কুত্তা-বিলাইয়ের মত বস্তিতে কোনমতে দিন-রাইত পার করতাছে, পেরতিনিদিরা ঠিকই মৌজ মারতাছে, পাবলিক চুপ।

কইয়া শেষ হইব না দাদারা – মোদ্দা কতা হইল পাবলিকের খেমতা ডুমুর গাছের ফুল হয়া ধইরা রইছে, আসেন ইলেকশানের আগে আগে সবাই কয়েকটা কইরা ছিড়া আনি।

ঈশ্বরের রাজনৈতিক ক্ষমতালোভ

নাস্তিক মননের কোন রাজনৈতিক পরিচয় নেই। কোন একজন ব্যাক্তি যখন ঈশ্বরের ধারনাকে অস্বীকার করার মত অবস্থায় পৌঁছান, তখন তার মনে নাস্তিকতাকে জড়িয়ে কোন রাজনৈতিক ধান্দা থাকে না। এটি এমন একটি নৈতিক অবস্থা যখন মানুষ তার অনৈশ্বরত্বকে কোন স্বার্থ হাসিল করতে ব্যবহার করতে লজ্জা বোধ করে। সামস্টিকভাবে হয়তো এর প্রকাশ-প্রচার হতে পারে, কিন্তু নাস্তিকতা কখনই জোর করে চাপিয়ে দেয়ার জিনিস নয় – নাস্তিকতা নিতান্তই ব্যাক্তিগত উপলব্ধি-অর্জন।

কিন্তু ঈশ্বরবিশ্বাসীরা দলবদ্ধ। তাদের মূল শক্তিও ঐক্যে, যুথবদ্ধতায়। যুগে যুগে তাই ধর্মবাদীরা ভীষণ শক্তিশালী। কার বিরুদ্ধে তারা এই শক্তি ব্যবহার করে? নাস্তিকদের বিরুদ্ধে? আংশিকভাবে তা ঠিক। কিন্তু ধর্মবাদীদের আসল টক্করটা তার বিরুদ্ধেই যে তাদের স্বার্থে ন্যুনতম আঘাত করতে পারে। স্বার্থের ব্যাপারে ধর্মবাদীদের সেনসিটিভিটি এতই প্রবল তারা নিজেদের দল বিভক্ত করতেও দ্বিধা করে না। একই ধর্মের ভিতরেও তাই এত বিভক্তি। খ্রীশ্চানিটি আর ইসলামে এই বৈশিষ্টটি নগ্নভাবে প্রকাশিত। সেক্ট আর মাজহাব, দল আর উপদল – এভাবেই স্বার্থের লোভে ধর্মবাদীর যুগে যুগে বিভক্ত হয়েছে।

তার পরেও তারা শক্তিশালী। তারা প্রচন্ড ভোক্যাল। তারা ভীষণ তৎপর। অস্তিত্ব রক্ষায় তারা অনুক্ষন সচেতন। প্রাচীন-মধ্য-আধুনিক সব যুগেই ধর্মবেত্তারা তাদের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে রাজনৈতিক পক্ষাপক্ষ অবলম্বন করার কৌশল। রাজা আর পুরোহিতের সম্পর্ক সাধারণ মানুষ স্মরণাতীত কাল ধরে দেখে এসেছে – রাজা ছাড়া পুরোহিত অচল, পুরোহিত ছাড়া অচল রাজা। মধ্যযুগে য়ুরোপীয় বর্বরতার পেছনেও ধর্মবাদীরাই ছিল। হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে কয়েকশত চার্চের কর্ণধার ধার্মিক(!) পুরুষেরা। আর এসবই করেছে রাজার সহায়তায়। বিনিময়ে রাজা পেয়েছে আফিমে আসক্ত প্রজাকূল, নির্জীব-নির্বিরোধী-নিরাসক্ত। পুরোহিত মানুষকে বিশ্বাস করিয়েছে, রাজা নমস্য, রাজাই পিতা, রাজাই পতি, (ঈশ্বরের পরে) রাজাই পালনকর্তা, শাসনকর্তা। সমন্তসমাজে রাজা আর ধর্মীয় পুরোহিত ছিল সত্যিকারের আত্মীয়। আর প্রজাকূল – শাসন, শোষন আর করুনার পাত্র।

যুগ পাল্টেছে, সমাজের কাঠামো পাল্টেছে। কিন্তু এখনো সমাজপতিদের রক্ষাকবচ হয়েই আছে ধর্মীয় পান্ডারা। দেশে দেশে সকল সরকারই তোয়াজ করে ধর্মের পতাকাবাহী যেকোন প্রাণিকেই – চাই সে মানুষ হোক আর জানোয়ার। অন্যভাবে বলতে গেলে ঈশ্বর এখন পর্যন্ত গণমানুষের হতে পারেনি। তিনটি পরিষ্কার দলে তাবৎ দুনিয়া এখন বিভক্ত – রাজদন্ডের মালিক, ধর্মবাদী গোষ্ঠী আর সাধারণ মানুষ। সংখ্যার সবচেয়ে কম প্রথম দল, তারপর একটু বেশি দ্বিতীয় দল, আর সবচেয়ে বেশি তৃতীয় দল। অথচ, সংঘবদ্ধতা আর শক্তির দিক থেকে এই ধারা উল্টোমুখী।

কিন্তু কেন? সহজে এক কথায় বলতে গেলে মানুষ ব্যস্ত ঘাম ঝড়িয়ে তার জীবিকা অর্জনে, পুরোহিত বা রাজদন্ডের মালিক কারো কাছ থেকেই সে কিছু পায় না চায়ও না। আর পক্ষান্তরে রাজপতির ক্ষমতার উৎসই জনতা (অবাক হবেন না, তারাও তাই বলে!)। জনতা কখনই জানতে চায় না, তারা কার ক্ষমতার উৎস? কার খেলার ঘুটি? সুতরাং রাজপতির প্রয়োজন জনতাকে বশে রাখবার। মাঝখানে ফড়িয়া হয়ে এঁটে বসে ধর্মবাদীরা। রাজার প্রয়োজন মেটায় তারা, বিনিময়ে উচ্ছিষ্ট কুড়িয়ে বেঁচে থাকে মাত্র। আবার রাজা আর ধর্মবাদীরা জনতাকে শেখায় এই ধর্মগোষ্ঠী বড়ই সম্মানের পাত্র!

স্বার্থের প্রয়োজনেই ধর্মবাদীরা ঈশ্বরকে করে তুলেছে রাজনৈতিক ক্ষমতালোভী। এখানে নীতির কোন স্থান নেই।

মাদ্রাসা শিক্ষা ভাবনা

মাদ্রাসা ব্যবস্থা বন্ধ হবে না থাকবে না নিয়ে বিতর্ক আজকের নতুন নয়। কিন্তু হতাশার কথা হচ্ছে ভাড়াটে বুদ্ধিজীবিদের দিয়ে রাস্ট্রের অঘোষিত মালিকেরা এ বিতর্ক চালু করেছে এবং চালিয়েও যাচ্ছে; কখনোই তার অবসান করেনি। একদিকে যেমন ধর্মভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা সচল রেখেছে, তেমনি বুর্জোয়া-শখ মেটাতে আলাদা রকমের ইংরেজী মাধ্যম শিক্ষা ব্যবস্থাও চলছে। আমরা চেয়ে চেয়ে দেখছি। বাঙালি মুসলমানেরা এখন তাদের সন্তানদের জন্য এ দুই শ্রেণীর শিক্ষার পেছনে ছুটছে নিরন্তর। বাংলা মাধ্যমে যত ভালো সিলেবাসই থাকুক না কেন তাতে এখন আর বাঙালির রোচে না। যারা অর্থনৈতিক কারণে পারছে না সে মধ্যবিত্তরাই কেবলমাত্র নিজেদের সন্তানদের এই মধ্যম শ্রেণীর শিক্ষা দিচ্ছে – বাধ্য হয়েই দিচ্ছে; পারলে অন্য লাইন ধরতো।

যাই হোক, ধর্মভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা যে সমাজকে ধীরে ধীরে বন্ধ্যাত্বের দিকে নিয়ে যাচ্ছে এতে কারো কোন সন্দেহ নেই। মাদ্রাসার ছাত্ররা যতটা না ধর্মজ্ঞান অর্জন করে তার চেয়ে বেশি শেখে পরধর্ম ঘৃনা করা, যতটা না ধার্মিক হয় তার চেয়ে বেশি হয় অসৎ। এর কারণ কি? মৌলিক দু’টো কারণ হচ্ছে, ১) ধর্মকে ব্যবহার করে একদল লোক তাদের ফায়দা হাসিল করতে চেষ্টা করছে আর ২) ধর্মের প্রসারের অত্যাবশ্যক নিয়ামক হিসেবে ধর্ম এসব লৌকিক দুর্বলতাকে মেনেই নিয়েছে। অথচ ধর্মের উদ্দেশ্যই হওয়ার কথা ছিল মানব কল্যান। প্রাচীন ও মধ্যযুগে ধর্মের এইরকম স্ববিরোধীতা খুব একটা অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু এই আধুনিক কালে যখন রাস্ট্র স্থিত কাঠামো পেয়েছে, সেখানে এধরনের সাংঘর্ষিক ব্যবস্থা কিছুতেই থাকতে পারে না।

একইভাবে পাশ্চাত্যের অনুকরণে ইংরেজী শিক্ষা ব্যবস্থাও সমাজে আরেকটি প্যারালাল শ্রেণী তৈরি করছে এবং ইতিমধ্যে করেছেও। কথা বাড়িয়ে পাঠকের আর বিরক্তি উৎপাদন করতে চাই না। শুধু দু’টো কথা বলি – এসব অকল্যানকর পদ্ধতি যত দ্রুত বন্ধ হয় ততই মঙ্গল। কিন্তু, যমুনার পানি অনেকদূর গড়িয়ে গেছে। মোল্লা-তাল্লবেলেমরা এখন রিভল্ট করতে শিখে গেছে অন্যদিকে মাথার উপর তাদের ধর্মের অন্ধ পাষান-বোঝা। চাইলেই আর এখন মাদ্রাসা বন্ধ করা সম্ভব না। এ সত্য স্বীকার করে নিয়েই আমাদের সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।